প্রতিবেশী দেশেও রুপি নিষিদ্ধে... | jamunanews24.com

মমিনুল ইসলাম: ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবেশি দেশগুলোতেও বিরূপ...

বাংলা  
 আন্তর্জাতিক
প্রতিবেশী দেশেও রুপি নিষিদ্ধের বিরূপ প্রভাব
Published : Thursday, 1 December, 2016 at 8:09 PM,  Read :  171  times.
প্রতিবেশী দেশেও রুপি নিষিদ্ধের বিরূপ প্রভাবমমিনুল ইসলাম: ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবেশি দেশগুলোতেও বিরূপ প্রভাব ফেলেছে মোদি সরকারের পুরনো ৫শ’ ও ১ হাজার রুপির নোট নিষিদ্ধ প্রক্রিয়া। ইকোনোমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট আশা করছে, এ প্রক্রিয়া প্রতিবেশিদের অর্থনীতিতে খুব সীমিত পরিসরে প্রভাব ফেলবে। তবে অল্প সময়ের জন্য ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের জটিলতার সম্মুখিন হবেন।

ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বলছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পুরনো রুপির নোট নতুন নোট দিয়ে বদল করতে বেশ কয়েকমাস সময় লাগবে। ফলে নোট অচল প্রক্রিয়ার প্রভাব কয়েকটি খাতে ২০১৭ সালের শুরু পর্যন্ত স্থায়ী হবে। এরপরেও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে সীমিত পরিসরে এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।

এছাড়া ভারতের অভ্যন্তরে নোট অচল প্রক্রিয়ায় অসংখ্য নিয়মকানুনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। নভেম্বরের শেষের দিকে দিল্লি ঘোষণা দেয়, সরকার ভুটানের মতো প্রতিবেশি দেশগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করতে শিগগিরই একটি নির্দেশনা জারি করবে। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের (এমসিআই) তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে (এপ্রিল-মার্চ) প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সর্বমোট বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যেখানে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ প্রতিবেশি দেশগুলো হলো- আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। প্রতিবেশিদের সঙ্গে ভারতের ১৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে এবং সুষম বাণিজ্য প্রবাহ নিশ্চিতে দেশটির ব্যাপক স্বার্থ রয়েছে।

ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ধারণা করছে, নোট নিষিদ্ধ প্রক্রিয়ায় আসন্ন মাসগুলোতে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য গুরুতরভাবে হোঁচট খেতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রতিবেশি দেশগুলোর অর্থনীতিতে সীমিত প্রভাব পড়বে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল ও ভুটান ভারতের ওপর বাণিজ্য নির্ভরতার কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদিও এইসব দেশের বাণিজ্যে ধীরগতি জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর কার্যত আঘাত হানবে বলে মনে করা হয় না।

ভুটানের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে প্রভাব

ভুটানের মুদ্রা এনগুল্ট্রুম ভারতের রুপির বিপরীতে স্থির রয়েছে। এছাড়া ভুটানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রয়াল মানিটারি অথোরিটি অব ভুটান (আরএমএ) রুপির অবাধ বিনিময়যোগ্যতা নিশ্চিতে রুপির যথেষ্ট রিজার্ভ বজায় রাখতে আগ্রহী। কেননা ২০১১-১২ অর্থ বছরে গুরুতর রুপি সঙ্কটে দেশটির অর্থনীতি ঘুরপাক খায়। আরএমএ’র বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ৩০ শতাংশই ভারতীয় রুপিতে রয়েছে। ভুটানের বর্তমানে ভারতীয় রুপির রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ২৮ বিলিয়ন রুপি। যদিও এ অর্থের মাত্র ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন রুপি নগদ অর্থে রয়েছে।

আরএমএ গভর্নর ডও তেনজিন বলেন, যেহেতু ৯৫ শতাংশ বাণিজ্য চেক অখবা ব্যাংক ড্রাফ্টের মাধমে হয়ে থাকে, তাই ভারতের নোট অচল প্রক্রিয়া ভুটানের অর্থনীতিতে সামান্য প্রভাব ফেলবে। যাইহোক, ভুটান ও নেপালে ভারতীয় রুপি বৈধ মুদ্রা এবং ভারতীয় পর্যটকদের ভুটানে ২৫ হাজার রুপির কাগজী মুদ্রা নিয়ে আসার অনুমতি রয়েছে। ভুটানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভারতীয় রুপি চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।

এছাড়া নতুন মুদ্রা ঘাটতি সীমান্ত এলাকায় পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের মাঝে লেনদেন সহ কিছু নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ভুটানের ফুয়েন্টশলিং সীমান্ত শহর থেকে ভারতে এলাচ ও আলু রপ্তানির পরিমাণ কমে গেছে। কেননা ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কাছে পরিশোধের মতো নগদ অর্থ নেই। নোট নিষিদ্ধের পর আলুর দাম প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে, আগামীতে আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, এই নোট নিষিদ্ধ প্রক্রিয়া ভুটান-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। কেননা পণ্য পরিবহনের জন্য ভারতের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ পরিশোধে নগদ মুদ্রার প্রয়োজন হয়।

এদিকে, নোট অচল প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে সীমান্ত এলাকার অনানুষ্ঠানিক মুদ্রা বাজারে রুপির বিপরীতে এনগুল্ট্রুমের মূল্য বেড়েছে ২০ শতাংশ। জানা যায়, কিছু ভারতীয় তাদের অঘোষিত উচ্চমূল্যের নোটের বিপরীতে এনগুল্ট্রুম কেনার চেষ্টা করছেন, যাতে পরবর্তীতে ওইসব নোট লাভে রুপিতে পরিবর্তন করতে পারেন। আরএমএ অস্বাভাবিক বেশি পরিমাণে রুপি জমার মতো সন্দেহভাজন লেনদেনের বিষয়ে সতর্কাবস্থায় থাকতে তাদের আর্থিক গোয়েন্দা শাখা ও স্থানীয় ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে। আরএমএ গত ১৮ নভেম্বর ভুটানের সকল ব্যাংককে পুরনো রুপি নোটের বিনিময়ে এনগুল্ট্রুম উত্তোলন স্থগিত রাখারও নির্দেশ দেয়। যদিও তারা পুরনো রুপি জমা নেয়া অব্যাহত রেখেছে।

ভুটান ও নেপালের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপ

ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত সরকার নেপালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (নেপাল রাষ্ট্র ব্যাংক) ও ভুটানের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে (আরএমএ) জমাকারীদের যাচাই-বাছাই করে তাদের কাছ থেকে পুরনো রুপি নোট জমা নেয়ার জন্য নির্দেশ দিতে যাচ্ছে। পরবর্তীতের তাদেরকে এ অর্থ বদলিয়ে নতুন নোট দেয়া হবে।

ইতোমধ্যে এই সিদ্ধান্তের আশায় ভুটান (নেপাল বাদ, কেননা দেশটি রুপির লেনদেন নিষিদ্ধ করেছে) সেদেশের ব্যাংকগুলোকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এইসব নোট জমা নেয়ার অনুমতি দেয়। এর আগে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এর সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। যাতে করে ভারত ঘোষিত ৩০ ডিসেম্বরের সময়সীমার মধ্যে দেশটি মুদ্রা বিনিময় সম্পন্ন করতে পারে।

আরএমএ পুরনো রুপি নোট জমাদানের ক্ষেত্রে ভুটানিদের ওপর কোন সীমাবদ্ধতা আরোপ কেরিন। তারা স্থানীয় ব্যাংকে এসব নোট জমা দিতে পারবেন। তবে ব্যাংক থেকে এর বিনিময়ে নতুন নোটের নগদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যেখানে প্রতি মাসে ১০ হাজার রুপি উত্তোলনের অনুমতি দেয়া হয়। ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত ভুটানিরা ইতোমধ্যে ৮২৭ মিলিয়ন রুপি জমা দিয়েছেন। এ অর্থ উচ্চমূল্যের নোটে জমা দেয়া হয়েছে। যার পরিমাণ ১ বিলিয়ন রুপিতে ঠেকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ভারতে নেপালের অভিবাসী শ্রমিক ও নেপালি নাগরিকরা, যাদের কাছে পুরনো ভারতীয় রুপি রয়েছে, স্থানীয় মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানে নেপালি মুদ্রায় অর্থ ভাঙাতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত অর্থ পরিশো্ধ করতে হচ্ছে। নতুন নোটের অভাবে নেপালি নাগরিক, বিশেষ করে ভারত সীমান্ত সংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকে উচ্চমূল্যে তাদের মুদ্রা বদল করতে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। নেপাল ও ভারতের মধ্যে যারা ব্যবসা পরিচালনা করেন, তারা চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন হয়েছেন বলে জানা যায়। নগদ অর্থ ঘাটতি ও পুরনো নোট ব্যবহারের ওপর অনিশ্চিয়তার মধ্যেই কিছু লেনদেন বাতিল করা হয়েছে। যাইহোক, বাণিজ্যিক চ্যানেল ছাড়িয়ে আমরা আশা করছি অল্প সময়ে সামগ্রিকভাবে নেপালের অর্থনীতিতে সীমিত প্রভাব ফেলবে।

নগদ অর্থ সঙ্কটের প্রভাব

নগদ অর্থ সঙ্কটের ফলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যে ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। হাজার হাজার ট্রাক সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় আটকা পড়েছে। যেহেতু অর্থনৈতিক কার্যক্রম বেশিরভাগই নগদ অর্থের ভিত্তিতে করা হয়, তাই নতুন মুদ্রা নোটের অনুপস্থিতি ও পুরনো নোট গ্রহণে অনীহা কিছু আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমে স্থবিরতা এনেছে। ট্রাক চালকদের প্রাত্যহিক খরচ পরিশোধে নগদ অর্থ প্রয়োজন। তাই নগদ অর্থের অভাবে স্বাভাবিকভাবেই তারা বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন। অনেকে ধারণা করেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কয়েক মাসের মধ্যেও পুরনো নোট বদলিয়ে নতুন নোট দিতে পারবে না। আসন্ন মাসগুলোতে আন্তঃসীমান্ত্ বাণিজ্যে নগদ অর্থ ঘাটতি ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।

প্রতিবেশী দেশেও রুপি নিষিদ্ধের বিরূপ প্রভাবনগদ অর্থ সঙ্কটে শ্রীলঙ্কার পর্যটকরা কিছু অসুবিধার সম্মুখিন হচ্ছেন এবং ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসায় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার তামিল সংখ্যালঘুরা অসুবিধার সম্মুখিন হয়েছেন। এদের অধিকাংশ সদস্যের কাছে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় নোট রয়েছে। কিন্তু তাদের তা কমমূল্যে বদলাতে হচ্ছে। তারপরেও নোট নিষিদ্ধ শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে সামগ্রিকভাবে নগণ্য প্রভাব ফেলবে।

ইন্টেলিজেন্স ইউনিট আশা করছে, লম্বা সময়ের ব্যবধানে নোট অচল প্রক্রিয়া দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণে ভারতের বৈদেশিক নীতির কৌশলকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। নোট নিষিদ্ধের ফলশ্রুতিতে প্রতিবেশি দেশগুলোর ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের কাছে খুবই কম পরিমাণ ভারতীয় রুপি থাকবে। তবে ভারত সরকার তাদের বৈদেশিক নীতি বিন্যাসের পরিবর্তন করবে না।

jamunanews24.com/momin/01 Dec 2016

� পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ �